তামাক কোম্পানির প্রলোভনে যুব সমাজ

তামাক কোম্পানির প্রলোভনে যুব সমাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক নওগাঁ : তামাকের ক্ষতিক্ষর বিষয়গুলো এখন আর কারো অজানা নয়। তারপরও মানুষ বিশেষ করে তরুন যুব সমাজ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে। কারণ তামাক কোম্পানির লোভনীয় প্রলোভন মূলক বিভিন্ন পুরস্কার ঘোষণা ,স্বাস্থ্য বিধি ক্ষুদ্র আকারে উল্লেখসহ চটকদার বিজ্ঞাপনে তামাক সেবনে উৎসাহিত হচ্ছে যুব সমাজ।
তামাক কোম্পানীগুলো তরুন যুব সমাজকে বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রদান,টিশার্ট উপহার, মোবাইল ফোনে চমকদার মেছেজ প্রদান, সিগারেট পান করলে স্মার্ট লাগে ইত্যাদি অসৎ প্রচারণার মাধ্যমে দেশের তরুন যুব সমাজকে প্রলোভনের ফাঁধে ফেলে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার বৃদ্ধি করতে সহায়তা করছে। যদিও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে গ্রহণ করা হচ্ছে নানা দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক হলেও বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে তামাক কোম্পানিগুলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে একজন অধূমপায়ীর তুলনায় একজন ধূমপায়ীর করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের ঝুঁকি ১৪ গুণ বেশী। এসকল তথ্য জানার পরও তামাক নিয়ন্ত্রনে সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তামাক কোম্পানীগুলো সারা বছরজুড়েই বিভিন্ন কুটকৌশল অবলম্বন করে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ২০২০-২১ বাজেটে তামাকের উপর বর্ধিত কর প্রত্যাহারের দাবি। অথচ তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি হলো দাম বাড়িয়ে একে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে আনা। এতে একইসঙ্গে তামাকের ব্যবহার কমে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বাংলাদেশে জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ তামাক কর কাঠামোর জন্য তা তামাক নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। তাই বাংলাদেশে কার্যকর তামাক কর ব্যবস্থার জন্য ‘জাতীয় তামাক কর নীতি’ প্রণয়ন জরুরি।
বহুস্তরভিত্তিক দুর্বল কর কাঠামো এবং তামাকজাত দ্রব্যের ধরণে বিচিত্রতার দরুণ দাম বাড়লে বিকল্প বেছে নেয়ার সুযোগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখে সময়োপযোগী তামাক কর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবী। প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে সে লক্ষ্য পূরণের জন্য একটি বিস্তৃত তামাক কর নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পূরণে অতি সত্ত্বর জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। যার মধ্যে করারোপসহ, কর আদায় পদ্ধতি ও পর্যবেক্ষণ, ট্রাকিং ও ট্রেসিং, কর ফাঁকি বন্ধ, আমদানি-রপ্তানি, তামাক করসংক্রান্ত প্রশাসনিক বিষয়াদিসহ তামাক করসংশ্লিষ্ট সকল বিষয়াদি যুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশে মূল্যের ওপর শতাংশ হারে করারোপের ফলে তা তামাক নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে কোন অবদান রাখছে না বরং তা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তামাক কোস্পানির মুনাফা বৃদ্ধি করছে। বিগত ১০ বছরে তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন দ্বিগুণ বাড়লেও কোস্পানির মুনাফা বেড়েছে পাঁচ গুণ। এই অবস্থার পরিবর্তন মূল্যের ওপর শতাংশ হারে করারোপের পাশাপাশি সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপের দাবী
তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো থেকে প্রতিবছর সরকারের যে রাজস্ব আদায় হচ্ছে, পরোক্ষভাবে তার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত লোকদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য। তামাক সেবনের কারণে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জিডিপিতেও।
তামাক ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে আগামী বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর একই হারে উচ্চ মাত্রায় কর আরোপের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে সিগারেট থেকে ৯ হাজার ৯৩০ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা ও বিড়ি থেকে ২৩০ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় সিগারেট থেকে ১২ হাজার ২৬৭ দশমিক শূন্য ৩ কোটি টাকা ও বিড়ি থেকে ২৭৭ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। তামাক খাতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়া বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তারা বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে রাজস্ব দিয়েছে ৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তারা রাজস্ব দেয় ১১ হাজার ৫১ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের আইএইচএমইর ২০১৩ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৯৫ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও কয়েক লাখ। এসব ক্ষেত্রে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য খরচ তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের অনেক বেশি
অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বাংলাদেশ ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেলের (এনটিসিসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশনের (আইএইচএমই) ২০১৩ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৯৫ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করে আরও কয়েক লাখ। এসব ক্ষেত্রে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য খরচ তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের অনেক বেশি।

এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালে করা এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশের ১২ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত নানা ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, যক্ষ্মা, প্যারালাইসিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টসহ প্রধান আটটি রোগে আক্রান্ত হয়। এর ফলে রোগীর চিকিৎসা, অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্বের কারণে বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তামাক ব্যবহারের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বছরে নিট ক্ষতির পরিমাণ ওই সময় অনুযায়ী ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রতিবছর সিগারেট ক্রয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ ও বিড়ি ক্রয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়েছে।
একটি পরিবারের কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ করতে হয়। আর কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন তামাকের কারণে মারা যান বা রোগাক্রান্ত হন, তখন সেই পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এই ক্ষতি হিসাবের বাইরে।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার প্রতিরোধ ও মাদক নিয়ন্ত্রেণে নওগাঁ জেলায় কার্যরত প্রজন্ম মানবিক অধিকার উন্নয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান রিজভী জানান, তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভনে পরে যুবকরা তামাকের দিকে যাতে ধাবিত না হয় সেই দিকেও সজাগ দৃষ্ঠি রাখতে হবে অভিভাবক,শিক্ষক,সাংবাদিকসহ সচেতন সমাজের। কারন অন্যের সন্তান বিড়ি সিগারেটের মাধ্যমে মাদকাশক্ত হলে তার রেশ আপনার আমার সন্তানের উপরও পরবে এবং অর্থনৈতিক দায়ও অন্যভাবে আমাদের মাথার উপরও পরবে।
তাই তামাক কোম্পানীগুলোর সিএসআর এর নামে বা অন্যকোন ভাবে তরুন যুব সমাজকে উৎসাহ প্রদান,টিশার্ট উপহার, মোবাইলফোনে চমকদার মেছেজের মাধ্যমে প্রলোভন দিয়ে বিভ্রান্ত করে সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার প্রতিরোধ করতে বিদ্যমান আইনে যথাযথ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সমাজের সুধিজনরা।

শর্টলিংকঃ