নায্য মূল্য থেকে আর কতদিন বঞ্চিত হবে আমসত্ব তৈরী কারকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, শিবগঞ্জ

শিবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আমতা বা আমসত্ব তৈরীর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে যেমন কুটির শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে না। আবার অন্যদিকে তেমনি আমতা বা আমসত্ব তৈরী কারকরা নায্য মুল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আমের রাজধানী নামে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের মহিলারা আম থেকে আমসত্বা বা আমতা তৈরী করে থাকে। কিন্তু তারা কোনদিনই নায্য মুল্য পাইনি। শিবগঞ্জের ১৫ টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় ৩ হাজার মহিলা আম থেকে আমতা বা আমসত্বা তৈরী করে।

মনাকষার মানুয়ারা বেগম, মোবারকপুরের বৃষ্টি বেগম, শ্যামপুরের সায়েরা বেগম সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ২০-২৫ জন মহিলা আঞ্চলিক ভাষায় জানান, হামারঘে ছোট ছোট ছ্যাইলা পিইলারা আম বাগান থেকে আম কুড়িয়ে আনে। যেগলা গাহাকে (ক্রেতা) কিনে না(ক্রয়) সেগল্যা পানিতে ধুইয়া আগুনে গরম কইর‌্যা হামরা বাড়িতে ব্যবহার করা থালি বাটিতে বা বোলের উল্টা দিকে রুটির মতন (মত) পাতলা কইর‌্য্যা লাগিয়ে দিয়্যা রোদ্ধে(রোদে) শুকাতে দিই। শুকিয়ে গেলে থালি, বাটি বা বোল থেকে তুইল্যা রুটির মতন কইর্যা তুইল্যা যতন কইরা রাখি।

তারা আরো জানান, এক কেজি পাকা আম থেকে প্রায় ৩শ থেকে ৪শ গ্রাম আমতা হয়। সেগুলো গাঁয়ে (গ্রামে) আসা গাহাকের(ক্রেতা) কাছে ৩৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা কেজি দামে (দরে) বেচি (বিক্রী) করি। সে টাকা দিয়ে ছ্যাইল্যা পিলারা পাড়ার খরচ ও কিছু গৃহস্থালিতে লাগাই (খরচ করি)।

কানসাটের সানুয়ারা জানান, প্রশিক্ষন পেলে আমাদের তৈরী করা আমতাগুলো আরো উন্নতমানের হতো এবং ভালো দাম পেতাম। গ্রামে গ্রামে ফেরিওয়ালা হিসাবে আমতা ক্রয়কারী উপজেলার শ্যামপুর ইাউনিয়নের চামাবাজার এলাকার হাবিবুর রহমান হবির জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে আম মৌসুমে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মহিলাদের নিকট হতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে ৫০ কেজি হতে ১০০ কেজি পর্যন্ত আমতা ক্রয় করে কানসাটে বিভিন্ন আড়তে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রী করি। এ ব্যবসায় কোনদিন ৫শ টাকা, আবার কোনদিন ১ হাজার টাকা উপার্জন হয়।

একই ধরনের কথা বলেন শ্যামপুরের মতিউর রহমান, কানসাটের মশিউর রহমান, মোবারকপুরের এমালি হোসেন সহ আরো ১৫-২০জন ফেরিওয়ালা। তারা আরো জানান, শিবগঞ্জে প্রায় ৩শ জন ফেরিওয়ালা শুধু শিবগঞ্জ না পার্শবতী ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে আমতা ক্রয় করি। ৪ মাসের এ মৌসুমী ব্যবসা করে সারা বছরের খরচ যোগায়। তারা আরো জানান, কানসাট গোপালনগর মোড়ে আমতার আড়তে আমাদের ক্রতকৃত আমতা বিক্রী করি। এখানে প্রায় ২০-২৫ টা আড়ত আছে।

কুমিল্লার চাঁদপুর থেকে আসা হাবিবুর রহমান জানান প্রায় ২০ বছর থেকে আম মৌসুমে কানসাটে আমতার আড়ত দিয়ে আমতার ব্যবসা করে আসছি। প্রতিবছরই প্রায় ২৫ লাখ টাকা আমতা ক্রয় করে ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, নারায়নগঞ্জ সহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে বিক্রী করি। সমস্ত খরচ বাদে আমাদের কেজি প্রতি ৫টাকা করে লাভ থাকে।

তিনি আরো জানান, এখানে প্রায় ৩০টি আমতার আড়ত আছে। এ ৩০টি আড়তের মালিকরা প্রায় একই ধরনের ব্যবসা করে থাকে। আমতা তৈরী কারক মহিলাদের প্রশিক্ষণ ও এটিকে কুটির শিল্পের মর্যদা দেযার জন্য জেলা পরিষদের মহিলা সদস্য ও মহিলা আওয়ামীলীগের নেত্রী শাহিদা আখতার রেখা সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

এব্যাপারে উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, উপজেলা মাসিক উন্নয়ন কমিটির সভায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্তা গ্রহনের প্রস্তাব দিবো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাকিব আল রাব্বী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু লাইব ম্যাংগো মিউজিয়ামের আওতায় এনে আমতা তৈরী কারক মহিলাদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও এটিকে কুটির শিল্পের মর্যদা প্রদান সহ আমতা সংরক্ষণ ও বিদেশে রপ্তানী করার জন্য জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ডা: সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র শিবগঞ্জ উপজেলায় আম থেকে আমতা তৈরী কারক মহিলাদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও আমতা তৈরীকে কুটির শিল্পের মর্যদা প্রদানের মাধ্যমে আমতার নায্য মূল্য পাবার নিশ্চয়তা প্রদান ও আমতা তৈরী কারক মহিলাদের উৎসাহ প্রদানে প্রনোদনা দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহন করবো ইনশাল্লাহ।

শর্টলিংকঃ